একই টেস্টে লাল ও গোলাপি বল! প্লেয়িং কন্ডিশনে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথে আইসিসি
ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়: একই টেস্টে লাল ও গোলাপি বলের মেলবন্ধন
ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী ফরম্যাট টেস্ট ক্রিকেটে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) লাল বলের ঐতিহ্য বজায় রেখেও খেলায় নতুনত্ব আনার জন্য একই ম্যাচে লাল এবং গোলাপি উভয় বল ব্যবহারের প্রস্তাব বিবেচনা করছে। জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি ক্রিকেটের এই দীর্ঘতম সংস্করণে এমন এক পরিবর্তনের কথা ভাবছে, যা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
সাধারণত টেস্ট ক্রিকেটের সূচনা থেকেই লাল বলের ব্যবহার হয়ে আসছে। পরবর্তীতে দিবারাত্রির টেস্টের জন্য গোলাপি বলের আগমন ঘটে। কিন্তু এখন একই ম্যাচে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই দুই রঙের বল ব্যবহার করার যে প্রস্তাব এসেছে, তা প্রথাগত ক্রিকেট ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
কীভাবে কার্যকর হতে পারে লাল থেকে গোলাপি বলের এই রূপান্তর?
ক্রিকবাজের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট ম্যাচ চলাকালীন আবহাওয়া বা আলোর স্বল্পতার কারণে খেলা ব্যাহত হলে এই নিয়ম কার্যকর করা হতে পারে। ফ্লাডলাইটের নিচে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যদি উভয় দল সম্মত হয়, তবে লাল বলের পরিবর্তে গোলাপি বল ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ‘পারস্পরিক সম্মতি’ (Mutual Consent)। বোলিং দল যদি খারাপ আলো বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে গোলাপি বল ব্যবহার করতে চায়, তবে প্রতিপক্ষ দলেরও এতে সম্মতি থাকতে হবে। যদি কোনো একটি দলও এই বল পরিবর্তনের বিষয়ে অসম্মতি প্রকাশ করে, তবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য গোলাপি বল ব্যবহার করা যাবে না। এই রূপান্তর কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা হবে, তার বিশদ বিবরণ এখনো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
সৌরভ গাঙ্গুলী ও আইসিসি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
সম্প্রতি আইসিসির চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটির (CEC) একটি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আইসিসি ক্রিকেট কমিটির প্রধান তথা ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। আগামী ৩০ মে আহমেদাবাদে আইসিসি বোর্ডের আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এই প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা অনুমোদন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইসিসি কীভাবে তাদের নিয়ম ও প্লেয়িং কন্ডিশন পরিবর্তন করে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আইসিসি কীভাবে তাদের খেলার নিয়ম বা প্লেয়িং কন্ডিশন (Playing Conditions) পরিবর্তন করে থাকে। এটি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট এবং বহুধাপ বিশিষ্ট কমিটির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়:
- ক্রিকেট কমিটি (Cricket Committee): প্রাক্তন ক্রিকেটার, আম্পায়ার এবং কোচদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি প্রথমে ক্রিকেটের বিভিন্ন সমস্যা বা উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে এবং নিয়ম পরিবর্তনের খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে।
- চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটি (CEC): ক্রিকেট কমিটির খসড়া প্রস্তাবগুলো এরপর পাঠানো হয় সিইসি-র কাছে। আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর প্রধান নির্বাহীদের (CEOs) নিয়ে এই কমিটি গঠিত। তারা এই প্রস্তাবগুলোর সম্ভাব্যতা, খেলার ওপর এর বৈশ্বিক প্রভাব এবং ন্যায্যতা নিয়ে বিশদ আলোচনা ও বিতর্ক করেন। এরপর প্রস্তাবগুলো অনুমোদনের জন্য vote প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- আইসিসি বোর্ড (ICC Board): সিইসি-র সুপারিশগুলো শেষ ধাপে আইসিসি বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়। বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এবং সহযোগী সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই নিয়মগুলো চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
একবার কোনো নতুন নিয়ম অনুমোদিত হলে, আইসিসি তা কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। সাধারণত নতুন কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বা বড় কোনো আইসিসি টুর্নামেন্টের শুরু থেকে এই নতুন নিয়মগুলো বাস্তবায়ন করা হয়।
ওয়ানডে ক্রিকেটে বড় বদল: ড্রিংকস ব্রেকে মাঠে নামবেন প্রধান কোচ
লাল বলের ক্রিকেটের পাশাপাশি সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও বেশ কিছু চমকপ্রদ পরিবর্তন আসতে চলেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওয়ানডে ক্রিকেটে ড্রিংকস ব্রেকের সময় দলের প্রধান কোচের মাঠে প্রবেশের অনুমতি।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ড্রিংকস ব্রেকের সময় শুধুমাত্র অতিরিক্ত (সাবস্টিটিউট) খেলোয়াড়রাই মাঠে পানি বা বার্তা নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এখন থেকে হেড কোচ নিজেই মাঠের ভেতরে গিয়ে খেলোয়াড়দের সরাসরি কৌশলগত পরামর্শ দিতে পারবেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রতি ইনিংসে দুটি ড্রিংকস ব্রেক থাকে, যা সাধারণত ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর পর নির্ধারিত হয়। তবে মাঠে প্রবেশের সময় কোচদের দলের জার্সি পরা বাধ্যতামূলক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।
টি-টোয়েন্টির ইনিংস বিরতির সময় কমছে
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের গতিশীলতা আরও বৃদ্ধি করতে এবং ম্যাচের সময়সীমা কমিয়ে আনতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে আইসিসি। প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি (T20I) ম্যাচে দুই ইনিংসের মধ্যবর্তী বিরতির সময় ২০ মিনিট থেকে কমিয়ে ১৫ মিনিট করা হবে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম ইনিংসের খেলা শেষ হওয়ার পর থেকে দ্বিতীয় ইনিংসের খেলা শুরু হওয়া পর্যন্ত দলগুলো ২০ মিনিটের বিরতি পায়। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে দলগুলোকে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে আবার মাঠে নেমে পড়তে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ম্যাচগুলো আরও দ্রুত শেষ হবে এবং দর্শকদের জন্য খেলা দেখার অভিজ্ঞতা আরও টানটান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপসংহার
লাল ও গোলাপি বলের মিশ্রণ, কোচের মাঠে প্রবেশ এবং টি-টোয়েন্টির বিরতি কমানোর মতো এই প্রস্তাবগুলো যদি অনুমোদিত হয়, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। ঐতিহ্য বজায় রেখে আধুনিক ক্রিকেটের চাহিদার সাথে তাল মেলাতেই আইসিসির এই অভিনব প্রয়াস। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৩০ মে-র বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো কতটা সবুজ সংকেত পায়।